ঢাকা কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—‘প্রথম’ নারী শিক্ষক আখতার ইমামের গল্প
আজ ঢাকা কলেজ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নারী শিক্ষকের উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু প্রায় সাত দশক আগে এই দৃশ্য ছিল ব্যতিক্রম। এমন এক সময়ে, যখন উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষকতা—দুটিই ছিল পুরুষপ্রধান ক্ষেত্র, তখন এক নারী শুধু সেই জগতে প্রবেশই করেননি; দেশের ঐতিহাসিক দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন ‘প্রথম’ হিসেবে। তিনি আখতার ইমাম।
১৯১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার নারিন্দায় জন্ম তাঁর। সময়টা ছিল ব্রিটিশ শাসনামল। মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ তখনও খুব সীমিত। সেই বাস্তবতায় ইডেন গার্লস’ হাইস্কুল ও ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৩৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন আখতার ইমাম। এরপর কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৭ সালে দর্শনে অনার্সে অসাধারণ ফলাফল করে অর্জন করেন গঙ্গামণি দেবী মেডেল।
দর্শনের প্রতি তাঁর আগ্রহ তাঁকে আরও দূর নিয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। কিন্তু দেশেই উচ্চশিক্ষার পরিসর সীমাবদ্ধ রাখেননি। ১৯৫২ সালে বৃত্তি নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে দর্শনে মাস্টার্স করেন। সেখানে তাঁর শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক এ. জে. আয়ার ও এস. ভি. কিলিং। পরে ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিষয়ে আরও গবেষণা করেন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। প্রথমে নিজের পুরোনো প্রতিষ্ঠান ইডেন কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করার পর যোগ দেন ঢাকা কলেজে। সেখানেই তৈরি হয় তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম বড় ইতিহাস—তিনি হন ঢাকা কলেজের প্রথম নারী অধ্যাপক। পরে ওই কলেজের প্রথম নারী বিভাগীয় প্রধানও হন তিনি।
ঢাকা কলেজের পর তাঁর গন্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৩ সালে দর্শন বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেখানেও তিনি হয়ে ওঠেন ইতিহাসের অংশ। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আখতার ইমামের পথচলা কোনোভাবেই শুধু ‘প্রথম নারী শিক্ষক’ হয়ে থেমে থাকেনি। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে রিডার হন তিনি। একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন রোকেয়া হলের প্রথম স্থায়ী প্রভোস্ট হিসেবে। পরে ১৯৬৮ সালে তিনি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম নারী বিভাগীয় প্রধান।
একজন নারীকে কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রথমবারের মতো নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাতে হলে শুধু মেধা থাকলেই হয় না; প্রয়োজন হয় সাহস, অধ্যবসায় এবং প্রচলিত সামাজিক ধারণার সঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা। আখতার ইমামের জীবনে এই তিনটিরই দেখা মেলে।
তাঁর কর্মপরিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেও সীমাবদ্ধ ছিল না। দর্শনচর্চার পাশাপাশি তিনি নারীশিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান ফিলোসফিক্যাল কংগ্রেসের ১৫তম অধিবেশনে সাধারণ সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি—এই পদে দায়িত্ব পালন করা প্রথম নারী ছিলেন আখতার ইমাম। বাংলাদেশ ফিলোসফিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম কনভেনরদের একজন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
ব্যক্তিজীবনেও তাঁর সংগ্রাম ছিল কম নয়। মাত্র ২৫ বছর বয়সে স্বামীকে হারান তিনি। তিন সন্তানকে নিয়ে একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে শিক্ষকতা, গবেষণা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড—সবকিছু সামলে এগিয়ে যান। প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁর পথচলা থামাতে পারেনি।
শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক পরিচয়ের পাশাপাশি লেখক হিসেবেও নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন আখতার ইমাম। দর্শন, আত্মজীবনী ও সমাজ-সংস্কৃতির নানা বিষয়ে লিখেছেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘গল্প নয়’, ‘বহুরূপী’, ‘রোকেয়া হলে বিশ বছর’ এবং ইংরেজিতে লেখা ‘David Hume – On the Nature of the Self’।
দীর্ঘ কর্মজীবনে পেয়েছেন নানা স্বীকৃতি। ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বেগম রোকেয়া পদকে ভূষিত করে। লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি অব মেডিসিনের Wall of Honour-এও তাঁর নাম স্থান পেয়েছে।
২০০৯ সালের ২২ জুন ৯১ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন আখতার ইমাম। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর গল্প শেষ হয়নি। কারণ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পদ, পুরস্কার কিংবা ডিগ্রি নয়—তিনি যে পথটি তৈরি করে গিয়েছিলেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
আজ ঢাকা কলেজে নারী অধ্যাপকের সংখ্যা গুনতে হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে নারী শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধানও আর বিরল নন। কিন্তু একসময় এই পথের শুরুতে দাঁড়াতে হয়েছিল একজনকে।
সেই শুরুর সারিতে ছিলেন আখতার ইমাম—ঢাকা কলেজের প্রথম নারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষক এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম নারী বিভাগীয় প্রধান।
এক শতাব্দী আগে যে সমাজে একজন নারীর উচ্চশিক্ষা অর্জনই ছিল সাহসের বিষয়, সেই সমাজ থেকে উঠে এসে আখতার ইমাম প্রমাণ করেছিলেন—কোনো প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে ‘প্রথম’ হওয়া শুধু একটি পদবি নয়; কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি দরজা খুলে দেওয়ার নাম।
সম্পর্কিত খবর
admission-info
দুই বছরের প্রস্তুতি শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পথে UIU Aerial Robotics Team
প্রতিবেদক: সংগৃহীতপ্রথম বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয় দল হিসেবে SUAS 2026-এ অংশ নিতে যাচ্ছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
admission-info
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
প্রতিবেদক: সংগৃহীতজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) ও ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সদস্য সচিব সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা এ তথ্য জানান।
নিত্য তথ্য : বিশেষ আয়োজনে অংশ নিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
প্রতিবেদক: News Editorনিত্য তথ্য বিভাগের সর্বশেষ আপডেট, তথ্য ও বিশ্লেষণ এখানে প্রকাশিত হয়েছে।
নিত্য তথ্য : নতুন উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেড়েছে
প্রতিবেদক: News Editorনিত্য তথ্য বিভাগের সর্বশেষ আপডেট, তথ্য ও বিশ্লেষণ এখানে প্রকাশিত হয়েছে।